মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা, বাংলাদেশে জ্বালানি নিরাপত্তা ঝুঁকিতে
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শুরু হওয়া ভয়াবহ সামরিক সংঘাত এখন কেবল একটি আঞ্চলিক সমস্যা নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় এক দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তেহরানের ওপর ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের যৌথ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর ইরান পাল্টা আক্রমণ শুরু করায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।
এই সংঘাতের সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, এই সংকীর্ণ সমুদ্রপথটি যদি যুদ্ধের কারণে বন্ধ বা বাধাগ্রস্ত হয়, তবে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে বিপর্যয় নেমে আসবে, যার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হতে পারে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলো। বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়।
বর্তমানে যুদ্ধের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ায় এই রুট দিয়ে জাহাজ চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এর প্রভাব ইতিমধ্যেই দৃশ্যমান। গত শুক্রবার অপরিশোধিত তেলের দাম ২ শতাংশের বেশি বেড়েছে। গত ১৭ ফেব্রুয়ারিতে যেখানে তেলের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ৬১ ডলার, সাম্প্রতিক সামরিক পদক্ষেপের পর তা বেড়ে বর্তমানে ৬৭ ডলারে দাঁড়িয়েছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শান্তি আলোচনা ফলপ্রসূ না হওয়ায় এবং যুদ্ধ শুরু হওয়ায় এই দাম অচিরেই ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের ঝুঁকি কোথায়? বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য এই পরিস্থিতি এক মহাবিপদ সংকেত। কারণ দেশের প্রাথমিক জ্বালানির প্রায় ৯০ শতাংশ—যার মধ্যে অপরিশোধিত তেল, পরিশোধিত জ্বালানি এবং এলএনজি রয়েছে—এই হরমুজ প্রণালি দিয়েই আমদানিকৃত হয়ে বাংলাদেশে আসে। সৌদি আরব, ইরাক এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো প্রধান সরবরাহকারী দেশগুলো থেকে জ্বালানি আনার ক্ষেত্রে এই রুটটির কোনো কার্যকর বিকল্প নেই।
ফলে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হওয়া মানেই বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন এবং শিল্প খাত স্থবির হয়ে পড়া। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশের জন্য মূলত দুটি প্রধান ঝুঁকির কথা বলছেন। প্রথমটি হলো মূল্যঝুঁকি; আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) এবং এলএনজি আমদানিকারকদের খরচ বহুগুণ বেড়ে যাবে। এতে সরকারের ওপর ভর্তুকির পাহাড়সম চাপ তৈরি হবে, যা সামাল দিতে দেশীয় বাজারে জ্বালানির দাম বাড়ানো ছাড়া উপায় থাকবে না।
দ্বিতীয়ত, সরবরাহঝুঁকি; যুদ্ধের কারণে যদি শিপমেন্ট বিলম্বিত হয় বা বীমা প্রিমিয়াম বেড়ে যায়, তবে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানির তীব্র সংকট দেখা দেবে। এর ফলে কলকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হবে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চরম চাপ সৃষ্টি হবে। এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশে মুদ্রাস্ফীতি আবারও আকাশচুম্বী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জ্বালানির দাম বাড়লে সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বাড়বে, যা রপ্তানি পণ্যগুলোর উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানকে দুর্বল করে দেবে। এমতাবস্থায় বিশেষজ্ঞরা সরকারকে দ্রুত বিকল্প সরবরাহের উৎস খোঁজা এবং কৌশলগত জ্বালানি মজুত বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

মন্তব্য করুন