গঙ্গামতির ৫ হাজার একর খাসজমিতে বিমানবন্দর নির্মাণের সম্ভাবনা, বদলে যেতে পারে কুয়াকাটা-পায়রা বন্দরের অর্থনীতি
মোঃ নাঈমূর রহমান রনি, কলাপাড়া উপজেলা প্রতিনিধি: সাগরকন্যা কুয়াকাটাকে ঘিরে দক্ষিণাঞ্চলের পর্যটন, বন্দর, শিল্প, বিদ্যুৎ, মৎস্য ও সামুদ্রিক অর্থনীতির সম্ভাবনা দিন দিন বাড়ছে। তবে এ অঞ্চলের দ্রুত বিকাশে অন্যতম বড় বাধা এখনো সহজ ও দ্রুত আকাশ যোগাযোগ।
এ বাস্তবতায় পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতের পূর্ব দিকে গঙ্গামতি-ধুলাসার-কাউয়ার চর এলাকায় সরকারি খাসজমিতে আধুনিক বিমানবন্দর নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের প্রস্তাব নতুন করে আলোচনায় এসেছে। প্রস্তাবিত এলাকায় পাঁচ হাজার একরেরও বেশি সরকারি খাসজমি রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য ও প্রস্তাবনায় উল্লেখ করা হয়েছে। কারিগরি ও পরিবেশগতভাবে স্থানটি উপযোগী প্রমাণিত হলে ভূমি অধিগ্রহণের ব্যয় ও জটিলতা তুলনামূলক কম হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বর্তমানে কুয়াকাটা মাস্টারপ্ল্যানে চাকামইয়া ইউনিয়নের গাজুরবনিয়া এলাকায় বিমানবন্দরের সম্ভাব্য স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে। ওই স্থান পায়রা সমুদ্রবন্দর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার এবং কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে। এর তুলনায় গঙ্গামতি-ধুলাসার-কাউয়ার চর এলাকা কুয়াকাটা সৈকতের অনেক কাছাকাছি হওয়ায় নতুন করে স্থানটি বিবেচনার দাবি উঠেছে। আকাশ যোগাযোগে কমবে সময়, বাড়বে পর্যটন পদ্মা সেতু চালুর পর ঢাকা থেকে বরিশাল হয়ে কুয়াকাটায় যোগাযোগ অনেক সহজ হয়েছে। তবে বরিশাল থেকে কুয়াকাটা-কলাপাড়া-পায়রা এলাকায় এখনো দীর্ঘ সড়কপথ পাড়ি দিতে হয়।
এতে পর্যটক, বিদেশি পর্যটক, বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীদের সময় ব্যয় হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, কুয়াকাটার কাছে বিমানবন্দর নির্মাণ করা হলে ঢাকা ও দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে সরাসরি আকাশপথে পর্যটক ও ব্যবসায়ীদের যাতায়াত সহজ হবে। একই সঙ্গে পায়রা বন্দর, শিল্পাঞ্চল, ইপিজেড, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সামুদ্রিক অর্থনীতির সঙ্গে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের দ্রুত যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হবে। পায়রা-কুয়াকাটাকে ঘিরে বড় অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কলাপাড়া-পায়রা এখন আর শুধু পর্যটননির্ভর এলাকা নয়। এখানে রয়েছে পায়রা সমুদ্রবন্দর, সাবমেরিন ল্যান্ডিং স্টেশন, বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ঘাঁটি, রাডার স্টেশন, মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র, ইপিজেড ও বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।
পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং আরপিসিএল-নরিনকো ইন্টারন্যাশনাল পাওয়ার লিমিটেডের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার কারণে অঞ্চলটি ধীরে ধীরে বন্দর-বিদ্যুৎ-শিল্প-পর্যটননির্ভর অর্থনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে। পাশাপাশি পায়রা সমুদ্রবন্দরের উন্নয়নে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে ভূমি অধিগ্রহণ, নাব্যতা উন্নয়ন, ড্রেজিং ও যোগাযোগ অবকাঠামো সম্প্রসারণের কাজ চলছে। এ অবস্থায় বিমানবন্দর নির্মাণ করা গেলে পায়রা-কুয়াকাটা অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও গতিশীল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। শুধু বিমানবন্দর নয়, গড়ে উঠতে পারে পর্যটন বলয় বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় পর্যায়ের সংশ্লিষ্টদের মতে, কুয়াকাটার আকর্ষণ শুধু দীর্ঘ সমুদ্রসৈকতে সীমাবদ্ধ নয়। এখানে রয়েছে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার সুযোগ, চর বিজয়, লাল কাঁকড়ার আবাসস্থল, উপকূলীয় জীববৈচিত্র্য এবং রাখাইন জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী জীবনধারা।
রাখাইনদের বৌদ্ধবিহার, মঠ ও বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনাও পর্যটকদের আকর্ষণ করে। শুটকি পল্লি, সি-অ্যাকুয়ারিয়াম ও অ্যামিউজমেন্ট পার্কসহ অন্যান্য পর্যটন অবকাঠামো গড়ে উঠলে বিমানবন্দরকে কেন্দ্র করে একটি সমন্বিত পর্যটন বলয় তৈরি করা সম্ভব হতে পারে। প্রস্তাবনায় সম্ভাব্য রেলস্টেশন, আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়াম এবং কুয়াকাটা মাস্টারপ্ল্যানে নির্ধারিত স্পোর্টস জোনকে সমন্বয় করে ‘ইন্টিগ্রেটেড ট্যুরিজম অ্যান্ড স্পোর্টস সিটি’ গড়ে তোলার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কথাও বলা হয়েছে। পরিবেশ ও দুর্যোগঝুঁকি বিবেচনায় পূর্ণাঙ্গ সমীক্ষার দাবি তবে উপকূলীয় এলাকায় বিমানবন্দর নির্মাণের ক্ষেত্রে পরিবেশ ও দুর্যোগঝুঁকি বিশেষভাবে বিবেচনা করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। রানওয়ের দৈর্ঘ্য, জমির উচ্চতা, মাটির গঠন, পানি নিষ্কাশন, বন্যা ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, আকাশসীমা, বিমান চলাচলের নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যতে সম্প্রসারণের সুযোগ—সবকিছু যাচাই করে পূর্ণাঙ্গ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা। একই সঙ্গে পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও জলপ্রবাহের ওপর সম্ভাব্য প্রভাবও নিরূপণ করতে হবে। দুর্যোগপ্রবণ উপকূলীয় এলাকায় রানওয়ে ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণে দুর্যোগসহনশীল নকশার বিষয়টিও গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রয়েছে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা চরগঙ্গামতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আশীষ কীর্তনীয়া বলেন, গঙ্গামতি বর্তমানে অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন ও নৈসর্গিক একটি এলাকা। প্রতিদিনই এখানে পর্যটক-দর্শনার্থীর সংখ্যা বাড়ছে। বিমানবন্দর নির্মাণ হলে কুয়াকাটায় আসা পর্যটকদের জন্য গঙ্গামতি নতুন আকর্ষণ হয়ে উঠতে পারে। কুয়াকাটা ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের (টোয়াক) সভাপতি ও কুয়াকাটা উন্নয়ন ফোরামের যুগ্ম আহ্বায়ক রুমান ইমতিয়াজ তুষার বলেন, গঙ্গামতি সৈকতসংলগ্ন এলাকায় বিমানবন্দর নির্মাণের সম্ভাবনা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা উচিত। এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে কুয়াকাটার টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এখন প্রয়োজন সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু বিমানবন্দর নির্মাণের উদ্যোগ নিলেই হবে না।
বিমানবন্দর, পায়রা বন্দর, কুয়াকাটা পর্যটনকেন্দ্র, শিল্পাঞ্চল, বিদ্যুৎকেন্দ্র, যোগাযোগব্যবস্থা ও সম্ভাব্য রেলপথকে একটি সমন্বিত পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে। গঙ্গামতি-ধুলাসার-কাউয়ার চর এলাকায় বিমানবন্দর নির্মাণের সম্ভাবনা যাচাইয়ের পাশাপাশি তথ্য-উপাত্ত, পরিবেশগত ভারসাম্য, বিমান চলাচলের নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রয়োজন বিবেচনায় দ্রুত পূর্ণাঙ্গ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করা গেলে কুয়াকাটার আকাশপথের সম্ভাবনা বাস্তবতার আলোয় যাচাই করা সম্ভব হবে।

মন্তব্য করুন