বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির ঘোষণা আজ

নিজস্ব প্রতিবেদক:
প্রকাশ :
ছবি:সংগৃহিত


ঈদের পরপরই বাড়তি খরচের নতুন ধাক্কা আসছে বিদ্যুৎ গ্রাহকদের ওপর। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) আজ বুধবার বিদ্যুতের নতুন মূল্য ঘোষণা করতে যাচ্ছে। খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তবে স্বল্প আয়ের গ্রাহকদের জন্য চালু থাকা ‘লাইফ লাইন’ সুবিধায় আপাতত কোনো পরিবর্তন আনা হচ্ছে না।


 বিইআরসির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে গতকাল জানান, বুধবার সকাল ১১টায় কমিশনের কারিগরি কমিটির বৈঠকে ইউনিটপ্রতি মূল্যবৃদ্ধির হার চূড়ান্ত করা হবে। এরপর বিকেলের দিকে বিদ্যুতের নতুন ট্যারিফ ঘোষণা করা হতে পারে। নতুন মূল্যহার ১ জুন থেকে কার্যকর করা হবে। বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদও বলেন, ‘কারিগরি কমিটি বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে এবং আগামীকালই (আজ বুধবার) এ বিষয়ে ঘোষণা আসতে পারে।’


 সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্ত পূরণের অংশ হিসেবে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দুই মাস আগে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত একটি মন্ত্রিসভা কমিটি ইউনিটপ্রতি এক থেকে ১.৫০ টাকা পর্যন্ত দাম বাড়ানোর সুপারিশ করে। সেই সুপারিশ অনুযায়ী বিইআরসির মাধ্যমে মূল্য সমন্বয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যুতের দাম বাড়লে তার প্রভাব শুধু বিদ্যুৎ বিলেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, শিল্প-কারখানা, সেচব্যবস্থা, পরিবহন, কোল্ড স্টোরেজসহ প্রায় সব খাতেই উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। শেষ পর্যন্ত প্রভাব পড়বে নিত্যপণ্যের বাজারে। এতে শহরের মধ্যবিত্ত, ছোট ব্যবসায়ী ও ক্ষুদ্র শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি চাপে পড়বেন। কারণ বিদ্যুতের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাসাভাড়া, উৎপাদন ব্যয় ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রার খরচও বাড়তে পারে। এরই মধ্যে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির জেরে বাজারে নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। পরিবহনভাড়া বাড়ায় কৃষি ও খাদ্যপণ্যের সরবরাহ ব্যয় বেড়ে গেছে। এখন বিদ্যুতের দাম বাড়লে মূল্যস্ফীতির ওপর আরো বড় চাপ তৈরি হবে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের।


 বিদ্যুৎ বিভাগ ও বিপিডিবির কর্মকর্তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, ডলারের উচ্চ বিনিময় হার এবং এলএনজি, কয়লা ও তেল আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ অনেক বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক জ্বালানিবাজার আরো অস্থির হয়ে পড়েছে। এতে বিদ্যুৎ খাতে সরকারের ভর্তুকির চাপও বাড়ছে। মূলত ভর্তুকির চাপ কমাতেই বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। গত ২০ ও ২১ এপ্রিল অনুষ্ঠিত বিইআরসির গণশুনানিতে দেশের ছয়টি বিদ্যুৎ বিতরণ কম্পানি খুচরা পর্যায়ে ইউনিটপ্রতি ৮৫ পয়সা থেকে দুই টাকা পাঁচ পয়সা পর্যন্ত দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়। বিপিডিবি ৮৫ পয়সা, আরইবি এক টাকা ৭৭ পয়সা, ডিপিডিসি এক টাকা ৫৪ পয়সা, ডেসকো এক টাকা ৯৮ পয়সা, ওজোপাডিকো এক টাকা ৩৯ পয়সা এবং নেসকো দুই টাকা পাঁচ পয়সা বৃদ্ধির প্রস্তাব করে। তবে বিইআরসির কারিগরি দল গড়ে ইউনিটপ্রতি এক টাকা ২৫ পয়সা মূল্যবৃদ্ধির সুপারিশ করেছে। কমিশন সেই সুপারিশ গ্রহণ করতে পারে বলে জানা গেছে।


 সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে ইউনিটপ্রতি এক টাকার কম বৃদ্ধি করার সম্ভাবনা নেই। সূত্র জানায়, ২০০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম হারে মূল্যবৃদ্ধি করা হতে পারে। এরপর ২০০ থেকে ৪০০ ইউনিট, ৪০০ থেকে ৬০০ ইউনিট এবং ৬০০ ইউনিটের বেশি ব্যবহারকারীদের জন্য ধাপে ধাপে মূল্যবৃদ্ধির হার বাড়তে পারে। লক্ষ্য হলো বছরে প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় করা। বিইআরসির কর্মকর্তারা জানান, কমিশন কোনোভাবেই এখন লাইফ লাইনে হাত দেবে না। কারণ কয়েক বছর ধরে দেশের অর্থনীতি নিম্নমুখী। দেশে গরিবের সংখ্যা বাড়ছে। এ অবস্থায় লাইফ লাইন গ্রাহকদের ঘাড়ে বাড়তি বিল চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। বিপিডিবি জানায়, ২০২৬-২৭ সালে বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে কম দামে বিক্রির কারণে পিডিবির লোকসান হবে ৬৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ৪০ হাজার কোটি টাকার বেশি ভর্তুকি দেবে সরকারি এই সংস্থা। বিদ্যুতের দাম বাড়ালে ১০ থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা পাওয়া যাবে বলে আশা করছে বিপিডিবি। এর পরও বড় অঙ্কের টাকা ঘাটতি থেকে যাবে তাদের।


 অন্যদিকে বিইআরসির দুই দিনের শুনানিতে খুচরা পর্যায়ে বিভিন্ন শ্রেণির গ্রাহকের জন্য ১৫ থেকে ২৯ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। শুনানিতে পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ১৭ থেকে ২১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। সেখানে অংশ নিয়ে ভোক্তা প্রতিনিধি, অর্থনীতিবিদ, শিক্ষক ও শিল্প মালিকরা বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেন। তাঁদের অভিযোগ, বিদ্যুৎ খাতের অদক্ষতা, দুর্নীতি, সিস্টেম লস এবং ক্যাপাসিটি চার্জের দায় সাধারণ গ্রাহকদের ওপর চাপানো হচ্ছে। কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) প্রতিনিধিরা বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের মধ্যে নতুন করে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে জনজীবনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তাঁদের মতে, বিদ্যুৎ খাতের সুশাসন নিশ্চিত না করে এবং অপচয় ও অদক্ষতা কমানোর উদ্যোগ না নিয়ে মূল্যবৃদ্ধি কোনো গ্রহণযোগ্য সমাধান হতে পারে না। গণশুনানিতে অংশ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোশাহিদা সুলতানা প্রশ্ন তোলেন, প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়া হলেও এর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কোনো স্বাধীন আর্থিক নিরীক্ষা করা হচ্ছে না। 


তিনি বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পরিবর্তে কিভাবে দাম কমানো যায়, সে বিষয়ে পৃথক গণশুনানির অহ্বান জানান। সিনিয়র সাংবাদিক শুভ কিবরিয়া বলেন, জনগণের কষ্ট লাঘবের কথা বলা হলেও বাস্তবে নতুন করে বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদও শুনানিতে বলেন, ক্যাপাসিটি চার্জ বর্তমানে বিদ্যুৎ খাতের জন্য বড় বোঝায় পরিণত হয়েছে। এর ফলে ভর্তুকির পরিমাণ বেড়েছে এবং এটি জাতীয় অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি ও সংশ্লিষ্ট কম্পানিগুলোর আর্থিক নিরীক্ষার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে বলে আশ্বাস দেন তিনি। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, ‘নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর নতুন অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করতেই এই মূল্যবৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষক জেবুন্নেসা বলেন, ‘বিতরণ কম্পানিগুলোর সিস্টেম লস বন্ধ করা বিইআরসির কাজ নয়। অবৈধ সংযোগের কারণে যে লোকসান হয় সেটা সংশ্লিষ্ট বিতরণ কম্পানিকেই বন্ধ করতে হবে। দুর্নীতি বন্ধ না হলে দাম এভাবে বাড়াতে থাকতেই হবে।’


 বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসএমএ) বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের বিরোধিতা করে বিইআরসির কাছে সাত দফা দাবি দিয়েছে। বিএসএমএ বলেছে, বিদ্যুতের ব্যয় বাড়লে শিল্প খাত, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ‘নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্যের চাপে সাধারণ মানুষ এরই মধ্যে কষ্টে আছে। 


এর মধ্যে বিদ্যুতের দাম বাড়লে পণ্য ও সেবার উৎপাদন ব্যয় আরো বাড়বে, ফলে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পাবে এবং সীমিত আয়ের মানুষের জীবনযাত্রা আরো কঠিন হবে।