মুছে ফেলেছিলেন আসল পরিচয়, শেষ মুহূর্তে যেভাবে ধরা খেলেন জিয়ার খুনি

ডেস্ক রিপোর্ট:
প্রকাশ :
ছবি:সংগৃহিত


দীর্ঘ ৪৫ বছর নিজের পরিচয় গোপন রেখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ফাঁকি দিয়েছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মেজর (অব.) মো. মোজাফফর হোসেন। তবে শেষ মুহূর্তে নিজের পরিচয় জানাতে গিয়ে করা একটি ভুলই তার ছদ্মবেশের অবসান ঘটায়।


 সেই সূত্র ধরে রাজধানীর বনানী ডিওএইচএসে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করে ডিবি পুলিশ।মোজাফফর হোসেন তার আসল পরিচয় পুরোপুরি মুছে ফেলেছিলেন। তিনি সম্পূর্ণ নতুন একটি ছদ্মনাম ধারণ করেন এবং নিজের চেহারা ও বেশভূষায় পরিবর্তন আনেন। দীর্ঘ ৪৫ বছরে তার পারিবারিক যোগাযোগ এবং পুরোনো চেনা পরিমণ্ডলের সঙ্গে সব ধরনের সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিলেন, যাতে কোনোভাবেই কল ট্র্যাকিং বা নজরদারির মাধ্যমে তার সন্ধান না মেলে। 


জীবনের শেষভাগে এসে তিনি অত্যন্ত গোপনে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। বসবাস শুরু করেন রাজধানীর সবচেয়ে সুরক্ষিত ও অভিজাত এলাকাগুলোর একটি বনানী ডিওএইচএসে।একজন সাবেক সেনা কর্মকর্তা হিসাবে ডিওএইচএস এলাকাটি তার চেনা পরিবেশ হলেও, সেখানে তিনি নিজেকে একজন সাধারণ, বয়োবৃদ্ধ এবং রাজনীতিবিমুখ নাগরিক হিসাবে পরিচিত করে তুলেছিলেন। আশপাশের মানুষ বা প্রতিবেশীরা কেউই কল্পনাও করতে পারেনি যে, তাদের পাশে বসবাসকারী এই বৃদ্ধই আসলে বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম চাঞ্চল্যকর রাষ্ট্রপতি হত্যাকাণ্ডে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত প্রধান ঘাতক। এতদিন পর কীভাবে ধরা পড়ল ইতিহাসের এই খলনায়ক— জানতে চাইলে অভিযানে থাকা ডিবির একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ এড়াতে অপরাধীরা কত ধরনের কৌশল অবলম্বন করতে পারে, তার অন্যতম উদাহরণ এই মোজাফফর।


 নিজের অবয়ব, চালচলন, এমনকি পেশা ও বাসস্থান পরিবর্তন করে সে দীর্ঘদিন একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিচয়ে ছদ্মবেশে অবস্থান করছিল। এ কারণে পুলিশ ও গোয়েন্দা বাহিনীর কাছে তার অবস্থান সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট ক্লু ছিল না। তবে অপরাধ যতই নিখুঁত হোক না কেন, অপরাধীর কোনো না কোনো চিহ্ন বা সূত্র থেকেই যায়। এটাই নির্মম নিয়তি। আর সেই সূত্র ধরেই এত বছর পর তাকে ডিবি গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে। গ্রেফতারের সূত্র জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বলেন, ডিবির বিশ্বস্ত টিম জানতে পারে, গোয়েন্দা কর্মকর্তারা প্রাথমিকভাবে তার মেয়ের কর্মস্থলের সূত্র ধরে অনুসন্ধান শুরু করেন। 


জানা যায়, তার মেয়ে একটি বেসরকারি টেলিকম প্রতিষ্ঠানে (এয়ারটেল) চাকরি করেন। কয়েক মাস ধরে মেয়ের কর্মস্থল এবং গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে গোয়েন্দারা একটি সম্ভাব্য বাড়ির ঠিকানা চিহ্নিত করেন। বাড়িটি চিহ্নিত করার পর ডিবি কর্মকর্তারা বেশ কিছুদিন ধরে দূর থেকে লক্ষ্য রাখেন এবং ছদ্মবেশে সার্বিক পরিবেশ ও মোজাফফরের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করেন। গোয়েন্দাদের কাছে মোজাফফরের শারীরিক বৈশিষ্ট্যের একটি ক্লু আগে থেকেই নথিবদ্ধ ছিল।


 তার নাকের ঠিক নিচে একটি আঁচিল বা তিল সদৃশ কালো দাগ রয়েছে। চেহারা পরিবর্তন করলেও এই জন্ম চিহ্নটি পরিবর্তনের সুযোগ তার ছিল না। অভিযানে যাওয়ার আগে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা এই চিহ্নটিকে তাদের প্রধান শনাক্তকরণ সূত্র হিসাবে নির্ধারণ করেন। বুধবার গভীর রাতে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। করা হয় অভিযানের চূড়ান্ত পরিকল্পনা। গোয়েন্দা দল ছদ্মবেশে বাসার দরজায় কড়া নাড়ে।


 ভেতর থেকে দরজা খোলার পর অত্যন্ত নাটকীয় ও সুকৌশলে এগোয় পুরো প্রক্রিয়া। দরজা খেলার পর গোয়েন্দারা সরাসরি কোনো অভিযান বা গ্রেফতারবিষয়ক কোনো ভয়ভীতি না দেখিয়ে অতিথির মতো স্বাভাবিক আচরণ করেন। মেয়ের নাম ধরে জানতে চান অমুক (তার মেয়ে, যিনি এয়ারটেলে কাজ করেন) বাসায় আছেন কিনা। এ সময় গোয়েন্দা কর্মকর্তারা নিজেদের ‘এয়ারটেল অফিস’ থেকে আসা কর্মী হিসাবে পরিচয় দেন।